ইতালির পথে ১৫ দিন ধরে নিখোঁজ স্বপ্নবাজ ৩৫ তরুণ
তারিখ: ১৬-অক্টোবর-২০২৫
আখলাছ আহমেদ প্রিয় ॥

 স্বপ্নবাজ একঝাাঁক তরুণ। সকলেরই হাসি-খুশি মুখ। স্বপ্নের দেশ ইতালি যাবে এমন খুশিতে তারা আনন্দিত। গত ১ অক্টোবর হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমভাগ গ্রামের বাসিন্দা লিবিয়া প্রবাসী হাসান আশরাফের ফেসবুকে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে দেখা যায় এমন চিত্র। তবে সেই খুশি এখন তাদের পরিবারে দুঃশ্চিন্তায় রূপ নিয়েছে। স্বপ্নের দেশ ইতালি পাড়ি দিতে গিয়ে ১৫ দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছেন ৩৫ তরুণ। ওই তরুণরা বেঁচে আছে কি-না ? এমন দুঃশ্চিন্তায় দিন পার করছেন অভিভাবকরা। এর আগে গত ৩০ অক্টোবর লিবিয়া প্রবাসী চিহ্নিত দালাল হাসান আশরাফ ওরফে সামায়ুন মোল্লার মাধ্যমে একটি নৌকায় জেলার ৩৫ তরুণ ভূমধ্যসাগর হয়ে লিবিয়ার ত্রিপলি থেকে ইতালির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এর পর থেকে তাদের খোঁজ মিলছে না। 
নিখোঁজ তরুণদের তালিকায় রয়েছেন বানিয়াচং উপজেলার যাত্রাপাশা তলাবপাড়া মহল্লার আলফাজ মিয়া রনি, মোজাক্কির আহমেদ, সিয়াম জমাদার, মিজান আহমেদ। একই উপজেলার শ্রীমঙ্গলকান্দি গ্রামের সাইফুল ইসলাম বাবু ও জুবাঈদ মিয়া। আজমিরীগঞ্জ উপজেলার শিবপাশার ইমন ও পারভেজ, পশ্চিমভাগের রফিকুল ইসলাম পবলু, হাবিবুর রহমান, সাব্বির, মাহি ওরফে রাহুল, উজ্জ্বল ও পিন্টু এবং নোয়াগড় গ্রামের মোঃ মোক্তাকির ও রবিউল। এছাড়া জেলা সদরের উমেদনগর, বানিয়াচংয়ের উত্তর সাঙ্গরসহ বিভিন্ন এলাকার তরুণরা রয়েছেন। এর মধ্যে নিখোঁজের তালিকায় শুধু পশ্চিমভাগ গ্রামের ৬ তরুণ রয়েছেন। তাদের প্রত্যেককে ১৭-১৮ লাখ টাকার বিনিময়ে অবৈধ পথে নৌকা যোগে ইতালি প্রেরণ করেছেন হাসান আশরাফ ওরফে সামায়ূন মোল্লা। 
সূত্র জানায়, আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমভাগ গ্রামের হাসান আশরাফ দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়ায় বসবাস করছেন। এ সুযোগে তিনি নিজ এলাকাসহ জেলার সহস্রাধিক তরুণদের অর্থের বিনিময়ে অবৈধপথে ইতালী পাঠিয়েছেন। জনপ্রতি ১৭-১৮ লাখ টাকা নেন তিনি। এতে করে কয়েক বছরে তিনি বনে যান শত কোটি টাকার মালিক। অভিযোগ রয়েছে, কম টাকা দিলে ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় তুলে দেয়া হয় তরুণদের। আর চাহিদানুযায়ী টাকা দিলে তিনি তরুনদের সহজেই পৌছে দেন ইতালিতে। তার মাধ্যমে ইতালি গিয়ে অনেকেই বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি সহজে তরুণদের ইতালি পাঠাতে আগ্রহী করে তুলতে এলাকায় গড়ে তুলেছেন সিন্ডিকেট চক্র। যাদের মাধ্যমে তিনি ইতালি গমনেচ্ছুকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন। এলাকায় দালাল হাসান আশরাফ ওরফে সামায়ূন মোল্লার প্রধান এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন পশ্চিমভাগ গ্রামের আব্দুল মুকিত মাস্টার। এছাড়া তার সিন্ডিকেটে কাজ করেন মিজানুর রহমানসহ অনেকেই। অভিযোগ রয়েছে, আব্দুল মুকিত মাস্টার তরুণদের পরিবারের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে হাসান আশরাফ ওরফে সামায়ূন মোল্লার কাছে প্রেরণ করেন। 
গতকাল বুধবার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমভাগ গ্রামে সরেজমিনে দেখা যায়, নিখোঁজ ৬ তরুণের পরিবারে চলছে আহাজারী। দীর্ঘদিন ১৫ দিন ধরে সন্তানরা নিখোঁজ থাকায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। নিখোঁজ তরুণদের বাড়িতে ভীড় করছেন প্রতিবেশি ও আত্মীয়-স্বজনরা। স্থানীয়দের কাছ থেকে ঋণ ও এনজিও থেকে টাকা নিয়ে সন্তানদের ইতালি পাঠানোর কারনে পাওনাদাররাও আসছেন তাদের বাড়িতে। একদিকে, প্রিয় সন্তান নিখোঁজ অন্যদিকে পাওনাদাররা বাড়িতে আসায় পাগল প্রায় হয়ে পড়েছেন পরিবারের লোকজন। কোন উপায়ন্তর না পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন তারা। ওই গ্রামের নিখোঁজ সাব্বিরের ছবি বুকে নিয়ে তার মা সন্তান জীবিত দেখতে চান বলে কান্না করে বার বার মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিলেন। 
আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমভাগ গ্রামের নিখোঁজ সাব্বিরের পিতা আব্দুল ওয়াহেদ জানান, প্রায় ৩ মাস পূর্বে সন্তানকে দালাল হাসান মোল্লা ওরফে সামায়ূন মোল্লার মাধ্যমে লিবিয়া পাঠান। পরে তার কথানুযায়ী সাব্বিরকে ইতালি পাঠানোর উদ্যোগ নেন। এক পর্যায়ে কষ্টের জমানো টাকা, এনজিও থেকে ঋন গ্রহন, বাড়ির জায়গা-জমি  ও গরু ছাগল বিক্রি করে হাসান মোল্লাকে প্রায় ১৮ টাকা দিয়েছেন। গত ৩০ অক্টোবর সাব্বিরকে নৌকা যোগে ইতালি পাঠিয়েছে বলে হাসান মোল্লা তাকে জানিয়েছে। 
সাব্বিরের মা বলেন, ‘দীর্ঘ ১৫ দিন ধরে আমার ছেলে সঙ্গে যোগাযোগ নেই। ছেলেটা কোথায় আছে জানি না। আমি ছেলেটাকে জীবিত দেখতে চাই, তাকে উদ্ধারের জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবী জানাই’। 
একই উপজেলার নোয়াগড় গ্রামের নিখোঁজ রবিউলের পিতা বাবলু মিয়া বলেন, ‘হাসান মোল্লা প্রথমে ৫ লাখ টাকায় লিবিয়া ও পরে ১২ লাখ টাকায় ইতালি পাঠাবে বলে চুক্তি করে। আমি সব টাকা তার লোকজনের কাছে দিয়েছি। গত ৩০ অক্টোবর সে আমার ছেলেকে নৌকা যোগে ইতালি পাঠিয়েছে বলে জানিয়েছে। গত ১৫ দিন ধরে আমার ছেলে কোন খোঁজ নেই। চিন্তা হচ্ছে ছেলেটা কোন পরিস্থিতি আছে’। 
একই গ্রামের নিখোঁজ মোক্তাকির মিয়ার ভাই মহসিন আহমেদ বলেন, ‘আমার ভাই ৪ মাস আগে হাসান আশরাফের মাধ্যমে লিবিয়া যায়। সেখান থেকে গত ৩০ অক্টোবর নৌকা যোগে ইতালির উদ্দেশ্যে রওয়ানা। ১৫ দিন ধরে সে নিখোঁজ রয়েছে। হাসান আশরাফ জানিয়েছেন সে বেঁচে আছে-কিন্তু আমাদের সাথে কোন যোগাযোগ হয়নি’। 
নিখোঁজ আলফাজ মিয়া রনির বড় ভাই মনির মিয়া বলেন, ‘গত ৩০ সেপ্টেম্বর লিবিয়ার ত্রিপলি থেকে ইতালির উদ্দেশ্যে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে চারটি নৌকা ছেড়ে যায়। এর মধ্যে একটি নৌকায় হবিগঞ্জের ৩৫ জন ৭০ ছিলেন। সেই নৌকাটিই নিখোঁজ হয়েছে। বাকি তিনটি নৌকা ইতালিতে পৌঁছেছে। তিনি আরও জানান, আজমিরীগঞ্জের পশ্চিমভাগ গ্রামের লিবিয়া প্রবাসী হাসান আশরাফের মাধ্যমে ওই ৩৫ জন ১৭ থেকে ২০ লাখ টাকা করে দিয়ে ইতালি যাওয়ার উদ্যোগ নেন।
এদিকে, ৩৫ তরুণ নিখোঁজের পর হাসান আশরাফ ফেসবুকের কমেন্টে দাবী করেন তার মাধ্যমে ৪টি নৌকায় ৮৮ জন বাংলাদেশী নৌপথে যাত্রা করেন। এর মধ্যে ৩ নৌকা ইতালী পৌচেছে। ১টি নৌকা নিজেদের দোষে তারা ডুবাই দিছে। তাদেরকে উদ্ধার করা হয়েছে। অনেককেই চিকিৎসা দেয়া হয়েছে, আবার অনেকেই জেল হাজতে রয়েছেন। তবে  কারা জেল হাজতে রয়েছে এখনো প্রমান পাওয়া যায়নি। এমনও হতে পারে যারা নিখোঁজ তারা জেলে আছে। তিনি লিখেন, যারা নিখোঁজ তাদের মা-বাবা কি জানেনা, ছেলের মৃত্যুর ঝুঁকি আছে। তাহলে তাদের সন্তানদের কেন অবৈধ পথে ইউরোপ পাঠাতে চায়? ফেসবুকের কমেন্টে এমন প্রশ্নও রাখেন তিনি। 
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল মুকিত মাস্টার সিন্ডিকেট চক্রের সঙ্গে জড়িত নন বলে দাবী করেন। 
আজমিরীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিবিড় রঞ্জন তালুকদার বলেন, ‘অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার পথে কয়েকজন তরুন নিখোঁজ হয়েছেন বলে সংবাদ মাধ্যমে জানতে পেরেছি। যদিও এখন পর্যন্ত নিখোঁজ সদস্যদের পরিবার থেকে কোন ধরনের লিখিত অভিযোগ পাইনি। পরিবারের লোকজন যদি আমাদের কাছে আসে উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে তাদের উদ্ধারে ব্যবস্থা গ্রহন করবো’।