ছিন্নমূল মানুষের ভালবাসাই ‘যাদুর কাঠি’ ॥ ৬১টি টাকার মালা ও ভালবাসায় সিক্ত আমজনতার চেয়ারম্যান সৈয়দ খলিল
তারিখ: ১৫-মার্চ-২০১৯
দিদার এলাহী সাজু ॥

বাহুবল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সমর্থিত দুই হেভিওয়েট প্রার্থীকে পরাজিত করে চমক সৃষ্টি করেছেন সৈয়দ খলিলুর রহমান। নির্বাচনে দলীয় শক্তি, এলাকার প্রভাব ও অর্থবিত্তের ঘাটতিকে যিনি পুরণ করেছেন অধম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে। ভয়কে যিনি জয় করেছেন সাহস দিয়ে। শুধুমাত্র প্রান্তিক জনতার নির্মল ভালবাসাকে পুজিঁ করেই যিনি রচনা করেছেন অন্যরকম এক মহাকাব্য। প্রতিষ্ঠিত করেছেন অনন্য এক ইতিহাস। যে ইতিহাস ইতিপূর্বে সিলেটের ছক্কা ছইফুর ব্যতিত আর কেউ করেছেন বলে কারো জানা নেই। যে কারনে জেলার সীমানা পেরিয়ে তিনি এখন সারাদেশে আলোচিত এক মূখ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তাকে নিয়ে চলছে তোলপাড়। নির্বাচনের পর থেকে তার বাড়িতে ভীড় জমাচ্ছেন অসংখ্য-অগণিত মানুষ। এ অবস্থায় কে এই ‘সৈয়দ খলিল’? এ নিয়ে সর্বমহলেই জেগেছে নানা কৌতুহল। জানা যায়, উপজেলার সাতকাপন ইউনিয়নের লোহাখলা গ্রামের দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম সৈয়দ খলিলুর রহমানের। তার বাবা এস.এম মনির উদ্দিন ছিলেন একজন সাদা-সিদে মানুষ। দারিদ্রতার কারনে উচ্চ শিক্ষাও গ্রহন করা হয়নি তার। যুবক বয়সে যোগ দেন বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে। পরে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ গোয়েন্দা সংস্থায়ও কাজ করার সুযোগ হয় তার। ১৯৯১ সালে চাকুরি ছেড়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহন করেন অখ্যাত সৈয়দ খলিল। এর পর থেকেই তাকে ঝেঁকে ধরে নির্বাচনের নেশা। সাধারণ মানুষের কাছা-কাছি থাকতে যোগদেন একটি মানবাধিকার সংগঠনে। ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে বাহুবলে তাকে নিয়ে ঘটে তুলকালামকান্ড। রসিকতার সুরে ‘ঘোড়া-ঘোড়া’ স্লোগানধারী উৎসুক জনতাকে শান্ত করতে পুলিশকে ছুড়তে হয় শত-শত রাবার বুলেট, কাঁদানো গ্যাস। মামলায় আসামী হয় হাজারো মানুষ। ওই নির্বাচনে বিজয়ী না হলেও আলোচনায় আসেন তিনি। একাধিক কেন্দ্র জয় করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পান সৈয়দ খলিল।

এবারের নির্বাচনেও একই প্রতিক নিয়ে ভোট যুদ্ধে অবতীর্ণ হন তিনি। কিন্তু প্রচলিত নির্বাচনের প্রধান উপকরণ হিসেবে স্বীকৃত ‘দলীয় শক্তি কিংবা এলাকার প্রভাব অথবা বিপুল অর্থবিত্ত’ কোনটাই ছিল না তার। শুধুমাত্র অধম্য ইচ্ছাশক্তি আর মনের সাহসেই চষে বেড়ান গ্রাম থেকে গ্রাম। প্রতিপক্ষ দুই হেভিওয়েট। এদের একজন আওয়ামীলীগ মনোনীত নৌকা মার্কার প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুল হাই আর অন্যজন একই দলের বিদ্রোহী সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল কাদির চৌধুরী (আনারস)। নির্বাচনে সবাইকে অবাক করে দখল করে নেন প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষের সিংহাসন।

বিজয়ের মূলমন্ত্র কি? কি সেই যাদুর কাঠি? এসব বিষয় নিয়ে  গতকাল বৃহস্পতিবার এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় তার নিজ বাড়িতে। জড়াজীর্ণ বাড়ির আঙ্গিনায় কর্মব্যস্ত একজন ক্ষেত মুজুরের মতই গণমাধ্যম কর্মীদের সাক্ষাৎকার দেন তিনি।

বলেন, ‘এ বিজয় আমার নয়, এটা গরিবের বিজয়। আমি নেতা নই, আম-জনতার চেয়ারম্যান’।

তিনি বলেন, ‘আমার যাদুর কাঠি সাধারণ মানুষ। বিজয়ের মূলমন্ত্র ছিন্নমুল মানুষের ভালবাসা। স্যুট-টাই পড়া ভদ্রলোকগন আমাকে ভোট দেননি। তারা আমাকে অবহেলা করেছেন, হিংসা করেছেন। আমার উপর ঘটেছে হামলা-মামলার ঘটনা। মূলত ভোট দিয়েছেন দিনমুজুর ও শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ। শুধু ভোটই দেননি, ভোটের সাথে দিয়েছেন টাকাও। নির্বাচনের আগে-পরে আমাকে দেয়া হয়েছে ৬১টি টাকার মালা। যার পরিমান প্রায় ২ লাখ টাকা’।

সৈয়দ খলিল বলেন, ‘কেন্দ্রে কেন্দ্রে এজেন্ট দেয়া হয়েছে নিজ দায়িত্বে। নিজেরাই দিয়েছেন ভোট কেন্দ্র পাহারা। এমন অনেক কেন্দ্র ছিল, যেখানে আমার এজেন্টই ছিল না। মহান আল্লাহই আমাকে রক্ষা করেছেন। আমি নেতা নই, একজন সেবক হয়ে বাহুবলবাসির ভালবাসার প্রতিদান দিতে চাই’।





প্রথম পাতা