হবিগঞ্জে অবৈধভাবে চলছে ৮৯টি ইটভাটা, হুমকিতে জীববৈচিত্র
তারিখ: ৬-জানুয়ারী-২০২৬
জাকারিয়া চৌধুরী ॥

 হবিগঞ্জ জেলায় যেন কোন ভাবেই নিয়ন্ত্রন করা যাচ্ছে না অবৈধ ইটভাটা। কোন ধরণের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে যে যেখানে পাড়ছে গড়ে তুলছে ইটভাটা। কৃষি জমি, বসতভিটা কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সব জায়গাই গড়ে উঠছে ভাটাগুলো। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, হবিগঞ্জ জেলায় মোট ৯০টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১টি ইটভাটার রয়েছে অনুমোদন। বাকি ৮৯টি চলছে অনুমোদনহীন অর্থাৎ অবৈধভাবে। জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর সাড়াষি অভিযান চালিয়েও ভাটাগুলোকে নিয়ন্ত্রনে আনতে পারছে না। যে যার মতো করে পরিচালনা করছে ভাটা। ফসলি জমি, নদীর পাড়, স্কুল কলেজ ও বসতবাড়ি ঘেঁষে প্রতিনিয়ত এসব ভাটা গড়ে উঠায় হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এসব অবৈধভাটার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের কঠোর নজরদারির দাবী স্থানীয় এলাকাবাসির। 
এদিকে- অবৈধ এসব ইটভাটা থেকে প্রতিনিয়ত নির্গত কালো ধোয়ায় বাড়ছে শ্বাস কষ্টসহ বিভিন্ন রোগবালাই। এছাড়াও ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে ভাটায় নেয়ার ফলে জমি হারাচ্ছে উর্বরতা। ভাটার বিষাক্ত বর্জে ব্যাঘাত ঘটছে কৃষি কাজে। দীর্ঘদিন যাবত প্রকাশ্যে এমন কার্মকান্ড চলে আসলেও প্রশাসন যেন নির্বিকার এমনই দাবী স্থানীয়দের। তারা বলছেন- মাঝে মধ্যে প্রশাসন অভিযান চালায়। অভিযানকালে সামান্য জেল জরিমানা করা হয়। যা যথেষ্ট নয়। যদিও প্রশাসন বলছে, অবৈধ ইটভাটা বন্ধে তৎপর রয়েছেন তারা। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ভাটা অভিযান চালিয়ে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। করা হয়েছে জরিমানাও। 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলায় ৯০টির মতো ইটভাটা রয়েছে। এরমধ্যে মাত্র ১টি ভাটার রয়েছে রয়েছে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রসহ যাবতীয় কাগজপত্র। বাকিগুলোর কোনটির নেই লাইসেন্স নবায়ন, আবার কোনটির রয়েছে নানা কাগজপত্রের ত্রুটি। জেলায় গড়ে উঠা ইটভাটাগুলোর মধ্যে বাহুবল ও চুনারুঘাট উপজেলায়ই শুধু রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক ইটভাটা। ফসলি জমি, নদীর পাড়, স্কুল কলেজ ও লোকালয়ের আশপাশে গড়ে ওঠা এসব ভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র। এসব ভাটা যেন হাপিয়ে তুলেছে ওই এলাকার সাধারণ মানুষের জনজীবন। যদিও প্রভাবশালীদের ভয়ে মুখ খুলতে পারে না অনেকেই। তাই এ বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী স্থানীয়দের। 
সরেজমিনে হবিগঞ্জ মিরপুর সড়কে গিয়ে দেখা যায়- সড়কের পাশে ৫ কিলোমিটারের মধ্যেই অন্তত ২০টি ইটভাটা রয়েছে। দূর থেকে তাকালেই দেখা যায় কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী ও চারপাশে ধুলোবালির ঝাপটা। ইটভাটায় বিপর্যন্ত পরিবেশের ভয়াবহতা বুঝা যায় আশপাশের গাছপালার দিকে তাকালে। সবুজ পাতাগুলো প্রায় বিবর্ণ হয়ে পড়েছে ধুলোর আন্তর। স্থানীয়দের অভিযোগ- ইটভাটা কারণে আশ পাশের এলাকায় গাছে কমেছে ফলের পরিমাণ, প্রভাব পড়েছে কৃষি জমিতেও। এছাড়াও ধুলোবালিতে বিপর্যন্ত এই জনপদের মানুষ। 
স্থানীয় বাসিন্দা রাজিব আহমেদ বলেন- ইটভাটার কারণে আমাদের কৃষি জমি ও ফসলের উপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। ভাটার পার্শ্ববর্তী জমিগুলোতে টমেটো ও ফুল কপির ফুল আসলেও পরবর্তীতে সেগুলো মরে যায়। তিনি বলেন- ভাটার শুধু ইট পুড়ছে সাথে সাথে আমাদের কপালও পুড়ে যাচ্ছে। মনির মিয়া বলেন- ইট ভাটার মাটি আনা নেয়ায় আমাদের এলাকার সড়ক ভেঙে যাচ্ছে। বৃষ্টির দিন আসলে সড়ক দিয়ে হাটাচলা করাই যেন দায়। কলেজ ছাত্র রফিকুল ইসলাম বলেন- অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা এসব ভাটা আমাদের পরিবেশের ভারসাম্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। হুমকিতে ফেলছে ফসলসহ মানুষের জনজীবন। এসব ভাটার বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। 
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ইটভাটাগুলো পরিবেশ এবং প্রতিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের কৃষি জমি থেকে যে পরিমাণ টপসয়েল নেওয়া হচ্ছে ইটভাটার জন্য এতে কৃষি ব্যবস্থা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এক্ষেত্রে পরিবেশ আইনের শতভাগ প্রয়োগের কোন বিকল্প নেই। 
হবিগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক হরিপদ চন্দ্র দাস বলেন- ইটভাটাগুলো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছে না। ৯০টি ভাটার মধ্যে মাত্র ১টি রয়েছে বৈধ বাকি সবগুলো ভাটা অবৈধভাবে চলছে। তিনি বলেন- ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের সহায়তায় বেশ কয়েকটি অবৈধভাটা এক্সেভেটর দিয়ে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আবার কয়েকটি ভাটার মালিককে জরিমানার পাশাপাশি দ্রুত কাগজপত্র ঠিক করতে বলা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় অভিযান চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন বলেন- আমি যোগদানের পর থেকেই অবৈধ ভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্যে নির্দেশ দিয়েছি। অভিযান অব্যাহত থাকবে। 
প্রসঙ্গত- সরকারি নীতিমালায় সবগুলো ইটভাটাকে পরিবেশসম্মত জিগজাগ চুল্লিকরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ সরকারি নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পরিচালিত হচ্ছে পরিবেশের ক্ষতিকারক এসব ইটভাটা। এসব ভাটায় পুড়ানো হচ্ছে বনের কাঠ।

প্রথম পাতা