শোক-সংগ্রাম পেরিয়ে সাংবাদিক আব্দাল মিয়ার পুত্র ফায়েদ-এর হিফজ সম্পন্ন
তারিখ: ১৯-এপ্রিল-২০২৬
বানিয়াচং প্রতিনিধি ॥

সংগ্রাম, ত্যাগ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো বানিয়াচংয়ের মোঃ সাইদুল হাসান ফায়েদ। জীবনের কঠিন বাস্তবতা, প্রিয় আপন বড় ভাইয়ের মৃত্যু শোক, নিজের অসুস্থতা এবং একের পর এক প্রতিকূলতা জয় করে অবশেষে পবিত্র কুরআনের হাফেজ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে  সে। ২০২৬ সালের ১৮ এপ্রিল তার এই সাফল্যের মধ্য দিয়ে পূরণ হয়েছে পরিবারের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন।
পারিবারিকভাবে জানা যায়, বানিয়াচং উপজেলার যাত্রাপাশা গ্রামের শিক্ষক ও সাংবাদিক মো. আব্দাল মিয়া এবং মাতা মোছা. রেহেনা আক্তারের পরিবারে তিন মেয়ে ও দুই পুত্র সন্তানের মধ্যে ফায়েদই এখন একমাত্র ছেলে। শুরু থেকেই বাবা-মায়ের পরিকল্পনা ছিল একজন সন্তানকে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত এবং অন্যজনকে কুরআনের হাফেজ হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বড় ছেলে ৯ম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে পরপারে চলে যায়। এতে পুরো পরিবার ভেঙে পড়ে। শোকের সেই গভীর অন্ধকারে ডুবে থেকেও তাঁরা ছোট ছেলে ফায়েদকে ঘিরেই নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। ২০১১ সালের ২৯ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া ফায়েদ শৈশব থেকেই মেধাবী ছিল। ২০১৭ সালে যাত্রাপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে সে। পাশাপাশি আরবী শিক্ষার ভিত্তি দৃঢ় করতে তাকে জনাব আলী সরকারি কলেজ রোডস্থ দারুন নাশাত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হয়। সেখানেও সে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে প্রথম স্থানে তৃতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়।
২০১৯ সালে আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া দারুল কুরআন মাদ্রাসার নুরানী বিভাগে ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে তার হিফজ যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু তাঁর পথটি ছিল না তেমন সহজ—অমনোযোগিতা, দীর্ঘ বিরতি, এমনকি ২০২০ সালের করোনা মহামারিকালে প্রায় দুই বছর পড়াশোনা বন্ধ থাকায় তার অগ্রযাত্রা বারবার থমকে যায়।
২০২২ সালে জামিয়া সাদিয়া বাসিয়াপাড়া মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পর তার জীবনে নতুন মোড় আসে। কঠোর পরিশ্রমে মাত্র এক বছরের মধ্যে আট থেকে দশ পারা মুখস্থ করে সে। পরিবার ও শিক্ষকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে তাঁর ভেতরে জেগে ওঠে নতুন আত্মবিশ্বাস। তবে এর মাঝেই প্রিয় শিক্ষকের বিদেশ গমন, প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন এবং অসুস্থতা আবারও তাকে পিছিয়ে দেয়।
২০২৩ সালে হবিগঞ্জের জালালাবাদ এলাকার আরেকটি মাদরাসায় ভর্তি হয়ে ১৬ পারা সম্পন্ন করে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে পুনরায় জামিয়া সাদিয়া ইসলামিয়া মাদরাসায় ভর্তি করা হয়। এ সময় ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার একটি অপারেশনও করতে হয়, যা তার পড়াশোনায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করে।
তবুও কোনো বাধাই তাকে থামাতে পারেনি। সুস্থ হয়ে আবারও নতুন উদ্যমে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করে ফায়েদ। অবশেষে অদম্য পরিশ্রম, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাসের মাধ্যমে ২০২৬ সালের ১৮ এপ্রিল পবিত্র কুরআনের হিফজ সম্পন্ন করে সে।
ফায়েদের এই সাফল্যে স্বজনদের মধ্যে বইছে আনন্দের বন্যা। তাঁর বাবা মো. আব্দাল মিয়া আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া আদায় করে বলেন, "অসংখ্য কষ্ট, ত্যাগ আর ধৈর্যের পর আজ একমাত্র ছেলের মাধ্যমে আল্লাহ আমার স্বপ্ন পূরণ করেছেন। আমি মহান আল্লাহর কাছে লাখো-কোটি শুকরিয়া আদায় করছি এবং শিক্ষকদের প্রতি অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি"।
স্থানীয়দের মতে, ফায়েদের এই অর্জন শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য এক অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা। কঠিন বাস্তবতার মাঝেও অটল মনোবল, অধ্যবসায় এবং আল্লাহর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস থাকলে স্বপ্ন যে একদিন বাস্তবে রূপ নেয়—ফায়েদের জীবনগাথা তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

প্রথম পাতা