স্টাফ রিপোর্টার ॥
নবীগঞ্জে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শন, তদবির বাণিজ্য, সরকারি কর্মকর্তাদের হুমকি-ধামকি এবং প্রশাসনিক কাজে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন নবীগঞ্জ পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. নুরুল আমিন। উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে থানার পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যেও তার কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় নুরুল আমিনকে গ্রেফতার এবং দল থেকে বহিষ্কারের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি দালালচক্রকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে তদবির বাণিজ্যে সক্রিয় রয়েছেন নুরুল আমিন। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ সুবিধা আদায় ও প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে নিয়মিতভাবে সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। কোনো কর্মকর্তা তার তদবিরে সাড়া না দিলে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, বদলির হুমকি এবং কয়েকজন লোক জড়ো করে মানববন্ধনের মাধ্যমে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা চালানো হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নবীগঞ্জে এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যেখানে কোনো কর্মকর্তা অবৈধ তদবির রক্ষা করলে তিনি “ভালো”, আর আইন ও নিয়মনীতি মেনে চললে তাকে অপপ্রচার ও চাপের মুখে পড়তে হয়। অবৈধ জায়গা-জমি, জলমহাল, বালুমহাল ও হাটবাজার কেন্দ্রিক তদবির বাণিজ্যে এবং নিরীহদের জায়গা দখলে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সচেতন মহলের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব খাটিয়ে এসব কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে।
সম্প্রতি একটি জলমহাল নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে তদবির করেন নুরুল আমিন। কিন্তু উপজেলা প্রশাসন নিয়মনীতি অনুসরণ করে উন্মুক্ত ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলে অন্য একজন ইজারাপ্রাপ্ত হন। এতে ক্ষুব্দ হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলে কয়েকজনকে নিয়ে মানববন্ধন করেন তিনি।
এদিকে সম্প্রতি নবীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসে গিয়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মারুফ আহমেদের কাছে একটি বিষয়ে তদবির করেন নুরুল আমিন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সরকারি বিধি অনুসরণ করে তার অনৈতিক তদবিরে সাড়া না দিলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, ভয়ভীতি ও বদলির হুমকি দিতে থাকেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে উপস্থিত লোকজনের সামনেই মারুফ আহমেদের দিকে তেড়ে যান এবং তাকে মারধরেরও চেষ্টা করেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শেখ ফজলুল হক মনি জানান, ঘটনাটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবগত করা হয়েছে।
অন্যদিকে জলমহাল ইজারা নিয়ে মানববন্ধনের ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে জানান, জলমহাল ইজারা প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি বা ঘুষ বাণিজ্যের সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “জলমহাল কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ নয় যে প্রভাবশালীরা সিন্ডিকেট করে ভোগ করবে। উপজেলা প্রশাসন প্রকৃত মৎস্যজীবীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।”
গত ১২ জানুয়ারি কাতার প্রবাসী এমদাদুর রহমানের নির্মাণাধীন বহুতল ভবন ও ভূমি দখলচেষ্টার অভিযোগেও নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে নবীগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় অভিযোগ করা হয়, জোরপূর্বক ভূমি দখল করতে গিয়ে প্রবাসীর আত্মীয়স্বজনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। মামলা রুজুর পরদিন বিএনপির ব্যানারে নবীগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) দুলাল মিয়ার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেন নুরুল আমিন ও তার অনুসারীরা।
এছাড়াও প্রবাসীর জায়গা দখলচেষ্টা ও প্রকাশ্যে হুমকির ঘটনায় বিএনপির কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের কাছেও লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
একের পর এক অভিযোগ, সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ঘটনায় নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। নবীগঞ্জের সচেতন মহল বলছে, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে প্রশাসনকে জিম্মি করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টা বন্ধ করতে এখনই কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। তারা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।