স্টাফ রিপোর্টার ॥
চুনারুঘাট উপজেলার ইকরতলী গ্রামের গৃহবধূ ফাহিমা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় দিন যত যাচ্ছে, ততই বেরিয়ে আসছে ভয়াবহ ও লোমহর্ষক তথ্য। এটি কোনো আত্মহত্যা নয়, এটি ছিল ঠাণ্ডা মাথায়, পূর্বপরিকল্পিত একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড, যার নির্মম সাক্ষী ছিল নিহতের নিজের অবুঝ শিশু সন্তান।
মামলার বাদী নিহতের পিতা মো. নুরুল হক সাংবাদিকদের সামনে সরাসরি কথা বলতে না চাইলেও, নিহতের ৭ বছর বয়সী শিশু জিহাদ মিয়ার মুখে উঠে এসেছে ভয়ংকর সত্য। শিশুটি জানায়, তার মাকে প্রথমে মারধর করা হয়, পরে ঝুলিয়ে রাখা হয়। একটি শিশুর এমন স্বীকারোক্তি পুরো ঘটনাকে নতুন মোড় দিলেও, হত্যার নেপথ্য চক্র ও উদ্দেশ্য নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। এ ঘটনায় এলাকাবাসী ও সচেতন মহল প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ফাহিমা হত্যাকাণ্ডকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিকল্পিত বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। কতিপয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর একজন পলাতক আসামির বক্তব্য ভিডিও করে প্রচার করছে, যাতে তাকে ও তার স্ত্রীকে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয় বলে প্রমাণ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই অপপ্রচার নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
হত্যা মামলার এজাহার অনুযায়ী, আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর ইয়াছিন মিয়ার পুত্র ইব্রাহিম মিয়া (৩০) ও তার স্ত্রী মোছা. মুক্তা আক্তার (২৫) এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের এজাহারভুক্ত আসামি। এছাড়াও মামলায় আরও ছয়জনকে সহযোগী আসামি করা হয়েছে।
হবিগঞ্জ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি-২ আদালতে দায়ের করা মামলায় নিহতের পিতা অভিযোগ করেন, গত ৫ জানুয়ারি বিকেলে চুনারুঘাট উপজেলার ইকরতলী গ্রামে মো. পণ্ডিত মিয়ার পুত্র মো. সুজন মিয়ার বসতঘরে তার মেয়েকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, সুজন মিয়া নিজ হাতে ফাহিমার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করেন। এ সময় মুক্তা আক্তার ডান হাত, ইব্রাহিম মিয়া বাম হাত, জিনুক মিয়া ও শামিম মিয়া দুই পা চেপে ধরে রাখেন। অপর তিন আসামি বাড়ির উঠান ও দরজায় পাহারা দেয়, যাতে কেউ বাধা দিতে না পারে। নিহতের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে চালাতে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়।
আরও বলা হয়, টিকটক কনটেন্ট তৈরিতে বাধ্য করা, দ্বিতীয় বিয়েকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে ফাহিমাকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হতো। ভয়াবহ এই হত্যাকাণ্ডের সময় নিহতের শিশু সন্তান ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল এবং পুরো দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে। এ ঘটনায় দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ১৪৩, ৩২৩, ৩০২, ২০১, ১১৪ ও ৩৪ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।
চুনারুঘাট থানার ওসি শফিকুল ইসলাম জানান, মামলাটি হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ওয়ারেন্ট থাকলে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হবে।