স্টাফ রিপোর্টার ॥
নবীগঞ্জ উপজেলায় সরকারি মালিকানাধীন একটি বিলে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে পুকুর খনন ও দখলের মাধ্যমে মাছ আহরণের অভিযোগ উঠেছে। এতে করে ওই এলাকার দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত গ্রামবাসীরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, নবীগঞ্জ উপজেলার বরকতপুর মৌজার ৯৫নং জে.এল (সাবেক ৯২), খতিয়ান নং-১, সাবেক দাগ নং- ৪৪০, (হালে ২১৬) অবস্থিত ৫ একর ৪৯ শতক বিলটি রেকর্ড অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার (জেলা প্রশাসক, হবিগঞ্জ) এর নামে তালিকাভুক্ত। স্থানীয়ভাবে ‘বস্তা বিল’ নামে পরিচিত এ বিলটি সায়রাত জলমহালের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং ইজারাযোগ্য জলমহাল হিসেবেও নিবন্ধিত নয়।
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, তারা দীর্ঘদিন ধরে এ বিল থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী মবু মিয়ার নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ‘বস্তা বিল’ অবৈধভাবে দখলে রেখে পুকুর খনন করে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকার মাছ বিক্রি করে নিজেরা লাভবান হচ্ছেন। এ চক্রের দখল ও প্রভাবের কারণে সাধারণ গ্রামবাসীরা বিলটিতে মাছ ধরার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েছেন।
ভুক্তভোগী গ্রামবাসীদের পক্ষে স্বাক্ষর সংগ্রহ করে গত ১৮ এপ্রিল ২০২২ তারিখে নবীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবরে একটি আবেদন করা হয়। পরে আবেদনটি নবীগঞ্জ সদর তহশীলদার বরাবরে প্রেরণ করা হলে তিনি দীর্ঘদিন তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ শেষে ১৬ আগস্ট ২০২২ তারিখে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর গ্রামবাসীরা তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহীন দেলোয়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও উচ্ছেদের দাবি জানান। কিন্তু সে সময় এক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার প্রভাব ও উৎকোচের অভিযোগ থাকায় সরকারি বিলটি অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা।
পরবর্তীতে গ্রামবাসীরা ২৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে নবীগঞ্জ সেনা ইনচার্জ বরাবরে একটি দরখাস্ত করেন। সেনা ইনচার্জ তাদেরকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে অভিযোগ দায়ের করার পরামর্শ দেন। সেই প্রেক্ষিতে সর্বশেষ ১৭ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে পুনরায় অভিযোগ দাখিল করা হয়।
এদিকে, ইউনিয়ন ভূমি অফিস নবীগঞ্জ সদর থেকে ২২ জুন ২০২৫ তারিখে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবরে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে ভূমিটির সরকারি মালিকানা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, উক্ত বিলটি আরএস ও এসএ উভয় রেকর্ডেই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক, হবিগঞ্জের নামে রেকর্ডভুক্ত এবং এটি সায়রাত জলমহালের আওতাভুক্ত নয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিলের চারপাশের মালিকানাধীন জমির মালিকরা বিভিন্ন সময়ে অবৈধভাবে বিলের অংশবিশেষ দখল করেন। অভিযুক্তরা দাবি করেছেন, নিজেদের জমিতে ফসল ফলানোর সুবিধার্থে শুষ্ক মৌসুমে পানিসেচের জন্য তারা বিলের বিভিন্ন অংশে পুকুর খনন ও পুকুর পাড়ে গাছ লাগিয়েছেন এবং তারা মাছ আহরণ করেন না। তবে বাদীপক্ষ অভিযোগ করেছেন, বাধা উপেক্ষা করে অভিযুক্তরা বিলের মধ্যে ডোবা ও পুকুর খনন করে অবৈধভাবে মাছ আহরণ করে দীর্ঘদিন ধরে লাভবান হয়ে আসছেন।
আসামীদের মধ্যে রয়েছেন- ছাও মিয়া, জুনাব আলী (উভয় পিতা মৃত নক্সা মিয়া), মবু মিয়া, আবু মিয়া (উভয় পিতা মামদ আলী), ছুফি মিয়া, ফারুক মিয়া (উভয় পিতা মৃত বাদশা মিয়া), লেচু মিয়া (পিতা মৃত আব্দুল জব্বার), আল আমিন মিয়া, চুনু মিয়া (পিতা মৃত চান মিয়া), ওসমান মিয়া (পিতা মৃত আইয়ূব মিয়া), শওকত আলী (পিতা মৃত কমলা মিয়া), জিতু মিয়া (পিতা মৃত মোবারক মিয়া), সুফি মিয়া (পিতা মৃত আব্দুল হান্নান) ও জিলু মিয়া (পিতা মৃত নুর মোহাম্মদ)। তারা সবাই নবীগঞ্জ উপজেলার পূর্ব জাহিদপুর/পূর্ব জাহিপুর এলাকার বাসিন্দা।
ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. দিদার হোসেন তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, সরকারি বিল হিসেবে রেকর্ডভুক্ত উক্ত ভূমিতে কে কতটুকু অবৈধ দখলে আছেন তা নিরূপণের জন্য সার্ভে প্রয়োজন। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে সরকারি নিয়ন্ত্রণে এনে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। গ্রামবাসীরা দ্রুত সরকারি বিলটি অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে উদ্ধার করে তাদের মাছ ধরার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।